ভাষা বদলি করুন

The Only way to stop any pain in your life is to accept the fact that nothing is yours, nothing was yours, and nothing will ever be yours. They are worldly attachments; given by Allah, belonging to Allah and returning beck to Allah.

December 07, 2017

ধর্মীও বিদ্ধেষের বলি ভালবাসার তাজমহল

দিন শেষে দেশে দেশে উগ্র ধর্মান্ধদের মধ্যে আসলেই কোন পার্থক্য নেই- সেটা যে ধর্মেরই হোকনা কেন। তাদের বিশ্বাস আলাদা হলেও তারা একই মশলা দিয়ে তৈরী, মানবতার উপরে তারা তাদের উগ্র ধর্মানুভূতিকে স্থান দেয়। এমনকি নিজেদের বৃহৎ স্বার্থের ক্ষতি করে হলেও!
আমাদের  দেশের  একটা খুবই অদ্ভু ব্যাপারের দিকে তাকাই। ১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্থান দুইটা আলাদা দেশ হলেও ভারতে মুসলিমদের সংখ্যা খুব একটা কম নয়। আর এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে কয়েক বার হয়ে গেছে ভয়ংকর প্রাণঘাতী দাঙ্গা। শুধুমাত্র ধর্মীয় বিশ্বাস আলাদা বলে ঝরে গেছে কত নিরীহ তাজা প্রাণ, পুড়ে গেছে কত লোকালয়। উগ্র হিন্দুবাদীতা ভারতে সব সময়ই ছিলো, তারা নানা ইস্যুতে ফোঁস-ফোঁস করতো। কিন্তু ক্ষমতায় ছিলো না বলে তাদের ভয়াবহতা বুঝা যায় নি। কিন্তু বর্তমান বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর বুঝা যাচ্ছে ঘৃণার বিষবাষ্পের তেজ কত!



গরুর মাংস ইস্যু বা লাভ জীহাদ ইস্যুতে প্রান্তিক অঞ্চলে মুসলিম পিটিয়ে মারার ঘটনা নিয়ে তো লিখে শেষই করা যাবে না। সম্প্রতি তাজমহল ইস্যুতে উগ্র হিন্দুবাদীরা তাদের ঘৃণার ভয়াবহতা দেখাই যাচ্ছে। তাজমহল শুধু ভারতের না, সারা দুনিয়ার মানুষের জন্যই একটা অমূল্য সম্পদ, অতূলনীয় স্থাপত্য নিদর্শন। সারা দুনিয়ার কাছে ভারতের লোগো হলো তাজমহল। বিভিন্ন হলিউডি-বলিউড মুভি সিরিয়ালে পর্যন্ত ভারত বলতে তাজমহলকে দেখায়। সেই তাজমহলের পিছনেই এখন লেগেছে ভারতের ক্ষমতাশীল দল- নিজেদের পর্যটন শিল্পের ক্ষতি করে হলেও তারা তাজমহলকে নিচু করতে উঠে পড়ে লেগেছে। কারণ- এটা একজন মুসলিম সম্রাটের তৈরী!

মুঘল সম্রাট শাহজানের প্রিয়তম স্ত্রী মমতাজ মহলের সমাধি হিসেবে বানানো এই মার্বেল পাথরের সৌধটার নির্মান কাজ শেষ হয়েছিলো ১৬৫৩ সালে, প্রায় ২০ বছর লেগেছিলো। ওই সময়ে ৩কোটি ২০ লাখ রূপি ব্যায়ে নির্মিত সৌধটি বর্তমান অর্থ মূল্য ৫২০০ কোটি রূপি! পৃথিবীর আধুনিক সপ্তমাশ্চর্যের একটি এই তাজমহল। প্রতিবছর লক্ষাধিক মানুষ ভারতে আসে শুধু আগ্রায় যমুনা নদীর তীরে অবস্থিত এই মনোরম সৌন্দর্যের নিদর্শন দেখতে। কিন্তু সম্প্রতি এই শুভ্র ঐশ্বর্যে লেগেছে কালিমার ছাপ!
এমনিতেই তাজমহলের আশে পাশে ঘন জনবসতি আর কলকারখানার জন্য পরিবেশ দূষণ হচ্ছে, এসিড বৃষ্টিতে মার্বেল পাথর ক্ষয়ে যাচ্ছে। এখন বেশির ভাগ সময় তাজমহলে চলে সংস্কার কাজ। তার উপর বিজেপি দল ক্ষমতায় আসায় তাদের আক্রোশ পড়েছে এই তাজমহলের উপর! উত্তর প্রদেশ সরকারের পর্যটন বিভাগ রাজ্যের প্রধান পর্যটন কেন্দ্রের যে তালিকা করেছে তাতে রাজ্যের প্রধান আকর্ষণ তাজমহলের নাম নেই! বিশ্বাস করতে পারেন? যে তাজমহলের নাম সারাদুনিয়ার মানুষ চেনে, তার জায়গা হয় না আমাদের দেশের একটা রাজ্যের পর্যটন তালিকায়! কি উপহাস! শুধু তাই না, সরকার হিন্দুধর্মীয় স্থানে পর্যটক আকর্ষণ করতে চায় বলে চলতি অর্থবছরে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যবাহী স্থানের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের ভাগ তাজমহলকে দেয়া হয় নি!

উত্তর প্রদেশের গেরুয়া বসনধারী সন্ন্যাসী নেতা যোগী আদিত্যনাথ প্রথম মানুষের নজরে আসেন ২০০৭ সালে ব্যাপক মুসলিমবিরোধী বক্তৃতার মাধ্যমে। ধর্মীয় উস্কানি দেওয়ার অপরাধে জেলেও গিয়েছিলেন তিনি। তিনার অধীনে সন্ত্রাসী একটা দল কাজ করে যাচ্ছে যারা মুসলিম স্থাপনাতে চোরাগুপ্তা হামলা করতো। এখন তিনি ক্ষমতায় আসায় প্রকাশ্যেই তীব্র মুসলিম বিরোধী বক্তব্য দিচ্ছে্ন। তিনি এখন তাজমহলের বিরুদ্ধে আক্রমণ শুরু করেছেন রাজ্য সরকারের সমালোচনা করে। কারণটা হলো, আগের রাজ্য সরকার বিদেশি অতিথিদের তাজমহলের রেপ্লিকা দিত। এটা ‘ভারতীয় সংস্কৃতি প্রতিফলন’ করে না বলে আদিত্যনাথ ঘোষণা দেন, রাজ্য সরকার এখন থেকে উপহার হিসেবে ভগবত গীতা দেবে! সে এমনকি জাতীয় সরকারকে মুসলমানদের ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারির আহ্বান জানিয়েছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঠিক যেটা করতে চেয়েছিলো। এই উন্মাদকে দ্রুত না থামালে এ ভারতের মুসলিমদের জন্য কি ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন নিয়ে আসে কে আসে কে জানে।

বিজেপির আরেক কট্টরপন্থী হিন্দুবাদী আইনপ্রণেতা সংগীত সোমের কথার বলেছে, তাজমহল ‘ভারতীয় সংস্কৃতির কলঙ্ক’; এটা ‘বিশ্বাসঘাতকদের হাতে তৈরি’, ‘ভারতীয় ইতিহাসে যার স্থান নেই’। তারা নাকি ইতিহাসই বদলে দেবে! আরেক ধর্মান্ধ ইতিহাসবিদ পি এন ওক মৃত্যুর আগে দাবি করে গিয়েছিলেন, এই সৌধের জায়গায় মূলত একটি শিবমন্দির ছিল, যার নাম ছিল ‘তেজো মহালয়া’। এখন ক্ষমতাসীন দের আস্কারা পেয়ে কিছু বিপথগামী হিন্দুত্ববাদীকে ইতিমধ্যে সেখানে শিবপূজা করতে দেখা গেছে। হিন্দুত্ববাদীদের মূল সংগঠন আরএসএস তাজমহলে মুসলমানদের নামাজ আদায় নিষিদ্ধের দাবি করেছে। আর এসবে কেন্দ্রীয় সরকারের মৌনতা অশুভ সংকেতই দিচ্ছে।

ধর্মীয় বিদ্বেষের জের ধরে তাজমহলের প্রতি এই আক্রোশের ফলাফল ইতিমধ্যে ভারত পেতে শুরু করেছে! ২০১২ সালের তূলনায় ২০১৫ সালেই তাজমহলে দর্শনার্থী ৩৫ শতাংশ কমে গেছে! ভারতের অভ্যন্তরীন পর্যটনও কমে গেছে! বাইরে থেকে তাজমহল দেখতে এসে এর করুণ হাল দেখে সমালোচনাও করছেন অনেক বিদেশী সেলেব্রেটিরাও!
এই ধর্মীয় বিদ্বেষ আর ঘৃণার লেলিলান শিখা কি গ্রাস করে নিবে প্রায় চারশো বছর ধরে ভালোবাসা আর শুভ্র সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা তাজমহলকে যাকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তুলনা দিয়েছিলেন “গালে গড়িয়ে পড়া অশ্রুবিন্দুর” সাথে? মানবিকতা কি পরাজিত হবে নাকি আবার একবার ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে ভারতের সচেতন মানুষেরা গর্জে উঠতে পারবে তাজমহলকে বাঁচাতে? এই ঘৃণার দাবানলের শেষ কোথায়?


No comments:

Popular Posts