ভাষা বদলি করুন

The Only way to stop any pain in your life is to accept the fact that nothing is yours, nothing was yours, and nothing will ever be yours. They are worldly attachments; given by Allah, belonging to Allah and returning beck to Allah.

November 08, 2019

বিশ্বনবী মোহাম্মদ(ﷺ)এর মৃত্যুর তারিখ নিয়ে আমাদের বিভ্রান্ত!

।।জাকারিয়া ইছলাম।।

নবী মুহম্মদের() জন্ম মৃত্যু নিয়ে আমাদের ভন্ডামির শেষ নেই। নবীজির জন্ম মৃত্যু একই তারিখে হয়েছে বলে যে একটা প্রচারণা আছে, সেটা মূলত সম্পুর্ণ ভূলএর মূল উদ্দেশ্য হলো, এই জন্ম মৃত্যুতে আল্লাহর একটা আলৌকিক ইশারা আছে এটা প্রমাণ করা। কিন্তু ঐতিহাসিক সত্যনিষ্ঠ সূত্রগুলো দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, নবী মুহম্মদ() জন্ম মৃত্যু একই তারিখে হয় নি। আল্লাহর অলৌকিক কোনো ইশারাও সেখানে ছিল না।
কিছু ব্যতিক্রম বাদে মুসলিম বিশ্বের প্রায় সকল গবেষক এই বিষয়ে একমত যে, নবী মুহম্মদ() জন্ম রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখে। কিন্তু মৃত্যু তারিখ নিয়ে বিতর্ক আছে। একদল অলৌকিকতা আরোপ করতে গিয়ে বলেন, হিজরি ১১ সনের ১২ রবিউল আওয়াল তারিখেই তাঁর মৃত্যু হয়। এখানেই সমস্যার শুরু। ১২ই রবিউল আওয়াল জন্ম তারিখের যথেষ্ঠ তথ্য থাকলেও একই তারিখে মৃত্যু হবার স্বপক্ষে কোনো তথ্যপ্রমাণ নেই। বরং এটা হুট করে আরোপিত একটা ঘটনা বলা যায়। এখন প্রশ্ন আসে, তাহলে নবী মুহম্মদ() প্রকৃতপক্ষে কত তারিখে মৃত্যুবরণ করেছিলেন? এক্ষেত্রে ইতিহাসে একটিমাত্র তথ্যসূত্রই পাওয়া যায়, যাতে আমাদের বিভ্রান্তি দূর হয়। বিভিন্ন সাহাবীদের বক্তব্যমতে, বিদায় হজ্জের পর মাত্র ৮১ দিন জীবিত ছিলেন হযরত মুহম্মদ()মুসলিম বিশ্বে স্বীকৃত তাফসীরগুলোতে এমনটাই বলা হয়েছে। এ হিসেবে ৯ জিলহজের বিদায় হজ্জের দিন থেকে ৮১ দিন যোগ করলেই আমরা প্রকৃত মৃত্যু তারিখটি পেতে পারি।


(১) প্রখ্যাত সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস বলেন, ‘৯ জিলহজ্জের সেই বিদায় হজ্জের পর রাসুলুল্লাহ () আর মাত্র ৮১ দিন পৃথিবীতে জীবিত ছিলেন।’ (তাফসীরে মা’রেফুল কোরআন)।

(২) ইবনে জারীর কর্তৃক ইবনে জুরাইজ হতে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- ৯ জিলহজের পর নবী করিম () ৮১ দিন জীবিত ছিলেন। (তাফসীরে দোররে মানসুর, ৩য় খন্ড, ২০ পৃষ্ঠা)।

(৩) হাজ্জ্বাজ কর্তৃক ইবনে জুরাইজ হতে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- ৯ জিলহজের বিদায়ী ভাষণের পর রাসুল () ৮১ দিন আমাদের সাথে অবস্থান করেছিলেন। (তাফসীরে তাবারী, ৪র্থ খন্ড, ৮০ পৃষ্ঠা)।

(৪) ইমাম বাগবী বলেন, হারুন ইবনে আনতারা তার পিতা হতে বর্ণনা করেন, বিদায়ী হজের পর তিনি (নবী মুহম্মদ ) ৮১ দিন জীবিত ছিলেন। (তাফসীরে মাযহারী, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৫)।

(৫) ইবনে জাবীর হতে বর্ণিত, আরাফাহ্ ময়দানের সেই বিদায়ী দিবসের পর রাসুলুল্লাহ () ৮১ দিবস জীবিত ছিলেন। ( তাফসীরে ইবনে কাসীর, ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ১৩)।

উপরে উল্লেখিত বর্ণনাগুলো থেকে এটা সুস্পষ্ট যে, বিদায় হজ্জের দিন থেকে ৮১ তম দিনে নবী মুহম্মদ মৃত্যুবরণ করেছিলেন। এখন আমরা যদি হিসাব করে দেখি তাহলে সঠিক মৃত্যু তারিখটা পাবো। আমরা সবাই জানি যে, ৯ জিলহজ্জের বিদায় হজ্জের সেই দিনটি ছিল শুক্রবার। যে কারণে শুক্রবারের হজ্জকে আকবরী হজ্জও বলা হয়। আমরা ৯ জিলহজ্জ শুক্রবার থেকে ৮১ দিন গণনা করবোআরবি মাস গণনার নিয়ম হলো এক মাস ২৯ দিনে হলে তার পরের মাস ৩০ দিনে। তারপরের মাস আবারো ২৯ দিনে। এভাবে জিলহজ্জ মাসের ৯ তারিখ থেকে গণনা শুরু করে ৮১ তম দিনের দিকে যেতে থাকলে (৯ তারিখ থেকে ২৯ তারিখ পর্যন্ত) ওই মাসের ২১ দিন যুক্ত হয়। জিলহজ্জ মাস আরবি বর্ষের শেষ মাস। তারপরে আসে মহররম মাস। আগের ২১ দিনের সাথে যুক্ত হয় মহররম মাসের মাসের পূর্ণ ৩০ দিন। তারপর আসে সফর মাস। এই মাসের ২৯ দিন। জিলহজ্জ মাসের ৯ তারিখ থেকে সফর মাসের শেষদিন পর্যন্ত সবমিলিয়ে হয় (২১+৩০+২৯) = ৮০ দিন। বাকি থাকে ১ দিন। সফর মাসের পরেই আসে রবিউল আওয়াল মাস। রবিউল আওয়াল মাসের ১ তারিখেই ৮১ তম দিন পূর্ণ হয়। অর্থাৎ হিজরি ১১ সনের রবিউল আওয়াল মাসের ১ তারিখেই নবী মহম্মদ () এর মৃত্যু হয়।

তাছাড়া এটা স্বীকৃত যে, নবীজির মৃত্যু হয়েছিল সোমবারে। এবং মৃত্যুর ৫ দিন পূর্বের এক বুধবারে তিনি সুস্থ্য হয়ে ওঠেন। যা মুসলিম বিশ্বে ‘আখেরি চাহার সোম্বা’ বলে পরিচিত। হিজরি ১১ সনের পঞ্জিকায় দেখা যায় সফর মাসের ২৫ তারিখে বুধবার ছিল। যার ৫ দিন পরেই মারা যান তিনি। ৫ দিন পর অর্থাৎ ১লা রবিউল আওয়াল ছিল সোমবার। আর এটা স্বীকৃত যে, সোমবারেই রাসূলের মৃত্যু হয়। এদিকে প্রচলিত ১২ রবিউল আওয়ালকে যদি মৃত্যু তারিখ ধরা হয়, তাহলে দেখা যায় সেদিন পড়ে শুক্রবার, এবং যা বিদায় হজ্জের দিন থেকেও ৯২ তম দিন পরে। যার কোনোভাবেই ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। সব হিসেবেই এটা প্রমাণিত হয় যে, রবিউল আওয়াল মাসের ১ তারিখেই নবী মুহম্মদ() মৃত্যু হয়েছিল, ১২ রবিউল আওয়ালে নয়।
এখন প্রশ্ন আসে, ১২ রবিউল আওয়াল কোথেকে উড়ে এসে জুড়ে বসলো? এর উত্তর পেতে হলে তখনকার আরবদের রীতিনীতি ও কিছু ঘটনা জানা দরকার। রবিউল আওয়াল মাসের ১ তারিখ সন্ধার আগে নবী মুহম্মদ() মদিনায় মারা গিয়েছিলেন। আরবি রীতিতে সন্ধার পরেই তারিখ পরিবর্তন হয়ে যেতো। সেখানে যোগাযোগের ক্ষেত্রে দ্রুতগতির কোনো মাধ্যম ছিল না। ১ তারিখের মৃত্যু খবরটি মদিনা থেকে মক্কা, দামেস্ক, তায়েফ প্রভৃতি স্থানে পৌছতে পৌছতে ২ তারিখ পড়ে যায়। এভাবে লোকমুখে নবী মুহম্মদ() মৃত্যুর দিনটি ১ অথবা ২ তারিখ হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে এবং পরে এভাবেই প্রতিষ্ঠিত হয়। উমাইয়ারা ক্ষমতায় আসার পর তখন ইসলাম প্রচারের সুবিধার্তে এবং নবী মুহম্মদের জন্ম মৃত্যুকে একটি অলৌকিক ঘটনা হিসেবে দেখানোর জন্য ১/২ তারিখকে কোনোপ্রকার ঐতিহাসিক ভিত্তি ছাড়াই সরাসরি ১২ তারিখে রুপান্তরিত করা হয়। খলিফাদের পৃষ্ঠপোষকতায় সরকারিভাবে ১২ই রবিউল আওয়ালকেই নবীজির মৃত্যুদিবস হিসেবে প্রচার করা হতে থাকে। যাতে জন্ম তারিখের সাথে মৃত্যু তারিখের একটা অদ্ভুত মিল দেখানো যায়। এতে ধর্মের অলৌকিকতার ভিত্তিটা আরো শক্তিশালী হয়।

এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, নবী মুহম্মদ() এর জন্ম মৃত্যুর তারিখ এক নয়, বরং ভিন্ন দুটি তারিখে তাঁর আগমন ও প্রস্থান। যাতে অলৌকিকতা প্রমাণের কোনো সুযোগ নেই। আমি এই লেখাটি লিখতে বাধ্য হয়েছি তাদের জন্য, যারা আমাকে দীর্ঘদিন যাবত ধর্মের অলৌকিকতা বিশ্বাস করাতে চেষ্টা করেছেন। এমনকি এটাও বলার চেষ্টা করেছেন যে, নবী মুহম্মদ() জন্ম ও মৃত্যু ঘটেছে একই তারিখে, সেটা আল্লাহর ইশারা। অথচ এটা প্রমাণিত যে, এই জন্ম মৃত্যু দিবসের মধ্যে কোনপ্রকার অলৌকিক মিল নেই, বরং এটা কিছু মানুষেরই সৃষ্টি, এবং পরবর্তীতে আমরা যাচাই না করেই একে অলৌকিক হিসেবে বিশ্বাস করে এসেছি।

No comments:

Popular Posts