ভাষা বদলি করুন

The Only way to stop any pain in your life is to accept the fact that nothing is yours, nothing was yours, and nothing will ever be yours. They are worldly attachments; given by Allah, belonging to Allah and returning beck to Allah.

September 24, 2018

ভালোবাসার পরাজয়

!! জাকারিয়া ইছলাম !!

আমি তখন ক্লাস নাইন, না কি টেনে পড়ি? মেয়েটাকে দেখেই বুকের ভেতর দম আটকে গেল। রাতভর কেমন কান্না কান্না লাগে। ঘুম হয় না। চোখ বুঝলেই সেই চোখ, সেই হাসি, সেই মুখ! কিন্তু উপায়? উপায় আবার কি? চিঠি! দুরুদুরু বুকে চিঠি লিখলাম। সেই চিঠি আমার বন্ধুরা নিয়ে গেলো মেয়েটির কাছে। ফিরে আসলো করুণ মুখ করে। মিষ্টি মুখের নরম মেয়েটা কঠিন গলায় বলে দিয়েছে, ‘এই চিঠি সে নেবে না। সে আমাকে চেনে না’।



আমি আসলেও খুব ভীতু । মেয়েদের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে পারি না। গলা শুকিয়ে যায়। হাত পা কাঁপতে থাকে। কি বলবো ভেবে পাই না। দরদর করে ঘামতে থাকি। সেই আমার সেদিন হঠাৎ কি হোল! মুহূর্তেই দুরন্ত সাহসী হয়ে গেলাম। চিঠিটা সার্টের পকেটে নিয়ে পরদিন ভোরে দাড়িয়ে রইলাম পি.এইচ.ই-র সামনে রাস্তার পাশে। সে আসলো। আমি খুব ধীর পায়ে সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। তারপর সার্টের পকেট থেকে চিঠিটা বের করে ছিড়ে টুকরু টুকরু করে হাওয়ায় উড়িয়ে দিলাম। সে অদ্ভুত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। আমি সহজ গলায় বললাম, ‘প্রেম করতে হলে চিঠির দরকার নেই, তাই না?’

সে জবাব দিল না। অদ্ভুদ চোখে তাকিয়েই রইলো। আমি আবার বললাম, ‘প্রেম করতে যা দরকার, তা আমার আছে। চিঠিটা যেখানে ছিল, ঠিক সেখানেই। ঠিক এই সার্টের পকেটের নিচেই’।

!!সে অবাক গলায় বলল, ‘কি?’!!
আমি বললাম, ‘মন’।

!!সে বলল, ‘ওটাতো সবারই থাকে’!!
আমি বললাম, ‘থাকে, তবে সবারটা আমার মতো না’।

!!‘আপনার মতো না কেন?’!!
‘কারণ, আমারটা দেখতে পায়'।

সে কোন জবাব দিল না। আমাকে পাশ কাটিয়ে হেঁটে চলে যাচ্ছিল। আমি শান্ত পায়ে হেটে তার পিছু নিলাম, !!‘তুমি আমাকে চেনো না?’!!
সে এবারও জবাব দিল না। চুপচাপ হেঁটে যাচ্ছে। আমি সামনে গিয়ে পথ আটকে দাঁড়ালাম।

!!‘আমাকে চেনো না?’!!
‘নাহ।’

!!‘চিনতে চাও’!!
‘নাহ’

!!‘তাহলে কি করে হবে? চিনতে চাইতেতো হবে। চাও?’!!
সে মাথা নাড়ল, ‘নাহ’।

!!‘কেন?’!!
‘ইচ্ছা নেই’।

!!‘ইচ্ছে নেই কেন?’!!

‘সেটা ইচ্ছে জানে, আমি কি করে জানবো?’

আমি আরেকটু কাছে এগুলাম। সে ভয় পেয়ে গেলো। আমি কাছে এগিয়ে নীচু গলায় বললাম, !!‘তাহলে আমি বলি?’!!
সে এবারও জবাব দিল না।

আমি বললাম, ‘চিঠি পড়ে আমাকে চিনতে হবে না। !!তুমি বলো কি জানতে চাও?’!!
সে বলল, ‘কিছুই জানতে চাই না’।

আমি বললাম, ‘এদিকে তাকাও’।
সে তাকাল। তার চোখে ভয়। আমি সেই চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘আমি জাকারিয়া। হাইস্কুলে পড়ি। লম্বায় ৫ ফিট ৩, ওজন ৪৭ কেজী। উচ্চতা অনুযায়ী এই ওজন মারাত্মক আন্ডারওয়েট। প্রায় ১৫ কেজী কম। এই জন্য আমার শরীরের এই বেহাল দশা। আমার নানি বলেন, আমি নাকি তাল পাতার সিপাই। বাতাসে ফুঁ দিলেই উড়ে যাবো। তবে নানি আরেকটা কথাও বলেন, আমাকে বিয়ে দিলে নাকি আমি মোটা হয়ে যাবো। সেক্ষেত্রে অবশ্য বউয়ের ভালো রান্না জানতে হবে। সুতরাং বুঝতেই পারছ, এই সমস্যার সমাধান তোমার হাতে। তুমি বাচ্চা মেয়ে, আমিও বাচ্চা ছেলে। সুতরাং এখুনি বিয়ে সম্ভব না। হাতে সময় আছে। এই সময়ের মধ্যে রান্না বান্না শিখে নাও। কিন্তু দয়া করে হাতে মশলার দাগ লাগাবে না। খবরদার!’

সে গোলগোল চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। সেই চোখ আরেকটু হলেই কোটর ছেড়ে বেড়িয়ে যাবে। আমি বললাম, ‘আমি ছাত্র মোটামুটি ভালো। তবে পড়াশোনা করতে ইচ্ছা করে না, মোঠেই না। তোমি জানো? লাষ্ট পরিক্ষায় অংকে পেয়েছি ৩১, কানের লতি ছুঁয়ে গুলি গেছে। সামনে মেট্রিক পরীক্ষা। অংকের ভয়ে এইবার কাপছি। কিন্তু এইবার বড় সমস্যা হোল ইংরেজী। আমার ধারনা, এইবার ইংরেজীতে গুলি আর কানের লতি ছুঁয়ে যাবে না, কান ফুটো করে মাথায় ঢুকে যাবে। ঘটনা ক্লিয়ার?’

ঘটনা তার কাছে ক্লিয়ার কি না বোঝা গেলো না। তবে তার হতভম্ব ভাব গভীর হয়েছে, এটা পরিষ্কারভাবে ক্লিয়ার। 

আমি হঠাৎ চোখের চশমা খুলে শার্টের কোনায় মুছতে মুছতে বললাম, ‘ওহ, আরেকটা কথা। আমি চোখে কম দেখি। মারত্মক রকম কম। আমার চোখ আর নাক দিয়ে জল পড়ে জল, সবাই মনেকরে আমি কাঁদছি কিন্তু না এটা আমার অসুখ। আমার চোখের পাওয়ার প্রতিদিন একটু একটু করে কমছে। ডাক্তার বলেছে, কোন একদিন আমি পুরোপুরি অন্ধ হয়ে যাবো। অন্ধ। তখন আর কিছু দেখতে পাবো না। কিচ্ছু না’। বলে হাসলাম। সে আমার চোখে চোখ তুলে তাকাল। ধীর। স্থীর। তার চোখে কি? জল?

আমি ফিসফিস করে বললাম, ‘ভয় পাওয়ারতো কিছু নেই, তোমাকে দেখতে আমার চোখেরতো দরকার নেই’।

!!‘মানে?’!!
‘ঐযে বললাম, সার্টের পকেটের নিচে একটা জিনিস আছে’।

!!‘তো?’!!
‘ওতেই দেখে নেব’।

!!‘কি আছে?’!!
এবার আমি জবাব দিলাম না। এক পা সরে গিয়ে ঘুরে দাঁড়ালাম। হাঁটছি। আচ্ছা, সে কি দাঁড়িয়েই আছে? না ছুটে আসছে?

না সে দাঁড়ইয়ে নেই চলে গেছে! তার অনেক দিন পর আমার কাছে একটা প্রেমপত্র আসলো, জীবনের প্রথমবার কেই আমাকে প্রেমপত্র লিখেছে, প্রেমপত্র পেয়েই আমি রীতিমত ভড়কে গিয়েছিলাম। পুরাটা চিঠিবরেই প্রেম ভালোবাসাপূর্ণ নানান কাব্যিক অভিব্যক্তি। সেইসকল কাব্যিক অভিব্যক্তির শেষেরদিকে লাল রঙের কালিতে বড়বড় অক্ষরে লিখাছিল, 'এই পৃথিবী যতদিন থাকিবে, তোমায় আমি ৩৩দিন ভালোবাসিব'। 

সেই পত্র পাঠকরা মাত্রই আমি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। মেয়েটির প্রতি আমার প্রবল ভালোবাসা ছিল, আমি তাকে প্রপোজও করলাম। কিন্তু এই জীবনে সে আমাকে কেবল ৩৩দিন ভালোবাসিবে জানিয়া দুঃখের আর সীমা রহিল না। সেই সীমাহীন দুঃখেই আমি তাকে নাকচ করিয়া দিলাম, মন তেকে ডিলিট করিয়া ফেলিলাম। কিন্তু বুকের ভেতর কী এক প্রবল বিরহ ব্যথায় আবিষ্ট হইয়া রহিলা, জীবনভর। 

তার কয়েক বছর পরে এইবার বাড়িতে গিয়ে তার সাথে আমার হঠাৎ দেখা হল এক শপিংমলে, ইতোমধ্যে তার বিবাহ ও সন্তান হয়েছে, কিন্তু আমার প্রতি তার সেই মুগ্ধতা, ভালবাসার নাকি এতটুকুন ঘাটতি হয় নাই। সে আমাকে দেখে কাঁতর কন্ঠে বললো, 'আপনার কী মনে আছে? কিশোরীবেলার সেই প্রবল ভালোবাসাকে আপনি কি নির্দয়ভাবেই না প্রত্যাঘাত করিয়াছিলেন? ভালোবাসাপুর্ন সেই হৃদয়টা কতোখানি কষ্ট পেয়েছিল জানেন?' আপনিত্ব প্রথমে আমাকে বলেছিলেন আপনি আমাকে ভালবাসেন। 
আমি বলিলাম, হ্যা বলেছি তবে 'সে কী ভালোবাসা? যে বলে এই জীবনে আমি তোমাকে মাত্র তেত্রিশ দিন ভালোবাসিব, সে কী রকম ভালোবাসা?'

আমার কথা শুনিয়ে তার মাথাখারাপ হইয়া যাওয়ার উপক্রম হইল। সে তার নিজের মাথার তালুতে হাত বুলাইতে বুলাইতে কহিল, 'সে কী কথা? আমিতো তেত্রিশ দিন লিখি নাই। আমি লিখিয়াছিলাম ততদিন। সম্ভবত বেখেয়ালে বা অতিরিক্ত উত্তেজনায় 'তত'র উপরে মাত্রা টানিতে ভুলিয়া গিয়েছিলাম। ফলে 'তত' হয়ে গিয়াছিল '৩৩'!

আমি বিস্ফারিত নেত্রে তাহার দিকে তাকাইয়া কাঁদিতে কাঁদিতে ভাবিলাম, 'আহারে মাত্রা, কী ভয়ানক! দুটি জীবনের একটি সফল প্রেমের গল্পে কিরূপ ভয়ানক সমাপ্তির মাত্রা টানিয়া দিয়াছে।।

No comments:

Popular Posts