।। জাকারিয়া ইছলাম।।
অনেক দিন থেকেই ভাবছিলাম রাজনীতি নিয়ে কিছু লেখি কিন্তু লেখা হয়ে ওঠে না। রাজনীতির নামে দেশে যা চলছে তা অসাধারণ। সশিয়াল মিডিয়ায় সরকার বিরোধী একটা ঝড় দেখতে পাচ্ছি এবারের নির্বাচন নিয়ে। কিন্তু এবার একটা কারনে লোকসভা নির্বাচন নিয়ে অনেকটা আগ্রহ জন্মেছে। আর এর কারণ হলো কানহাইয়া কুমার, যে বিহারের বেগুসারাই থেকে সিপিআই’র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে লড়ছে। কানাইয়া কুমার যুবকদের মধ্যে এতই আলোচিত যে এবার লোকসভা নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদীর বানারাস, বা রাহুল গান্ধীর আমেথি বা ওয়ানাডের চেয়ে বেগুসারাই মিডিয়ার কাছে বেশি আলোচিত।
কানহাইয়া কুমার সম্পর্কে জানার আগ্রহ আসে গত বছর খানেক আগে থেকে। ইউটিউবে ভিডিও স্ট্রিমিং করতে করতে হঠাৎ একটি ভিডিও সামনে আসে, যেখানে কানহাইয়া কুমার দিল্লির জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্রিডম স্কয়ারে দাঁড়িয়ে এমন এক ভাষন দেয় যেটা যে কোন সরকারের পক্ষে হজম করা অসম্ভব।
কানহাইয়া কুমারের মেইনস্ট্রিম রাজনীতিতে উত্থান মূলত ২০১৬ সালের ৯ ফেব্রইয়ারি তে ঘটে যাওয়া একটা ঘটনার পর। জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ে কাশ্মীরি নাগরিক আফজাল গুরুর ফাঁসির প্রতিবাদে কিছু মানুষ একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। এবং সেখানে নাকি ভারত বিরোধী স্লোগান দেওয়া হয়েছে। এর জের ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের সভাপতি পিএইচডি’র ছাত্র কানহাইয়া কুমার সহ উমর খালিদ, অনির্বান ভট্টাচার্য সহ অনেকের নামে দেশাদ্রোহ মামলা হয়। এই মামলায় ২২ দিন জেলে থাকার পর জামিনে মুক্তি পায় তারা, বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্রিডম স্কয়ারে দাঁড়িয়ে কানহাইয়া কুমার ৫২ মিনিটের যে স্পিচ দিয়েছিলেন, যেটাকে অনেকে ছাত্র রাজনীতির হিস্টোরিকাল স্পিচ হিসেবে গন্য করেন ৷ ওই স্পিচে নরেন্দ্র মোদী সহ তার অনেক বিজেপি মন্ত্রীর বিরুদ্ধে, তার হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির বিরুদ্ধে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে এমন সাহসী বক্তৃতা দিয়েছিল যে এক রাতের মধ্যে সারা দেশে আলোড়ন ফেলে দিয়েছিলেন ।
কানহাইয়া কুমার এখন দেশের অনেক যুবকের আইডল। তার ওরেটিং স্কিল এতই ভাল যে দূর-দুরান্ত থেকে শুধু তার বক্তৃতা শুনার জন্য মানুষ বিভিন্ন সভায় আসেন। তার রাজনৈতিক জ্ঞান, চিন্তাধারা, ভিশন এতটাই স্ট্রং যে সহজেই মানুষের মনোযোগ আকর্ষন করতে সক্ষম। যে কোন রাজনৈতিক নেতা তার সাথে ডিবেটে বসলে যে ন্যাংটা হয়ে যাবে সেটা সুনিশ্চিত।
কানহাইয়া আরেকটা কারণে বিখ্যাত। সেটা হলো- তার আজাদী স্লোগান।। দেশের নানা সম্যসা থেকে আজাদী বা মুক্তি পাওয়ার জন্য এই স্লোগান এতই বিখ্যাত যে এটা নিয়ে গানও আছে এমনকি বলিউড সিনেমা “গালি বয়” (মুভিতেও) এই গান যুক্ত করা হয়েছে।
কানহাইয়া কুমারের আরেকটা গুণ হল তাকে যতবেশি দেশাদ্রোহী বলা হয়েছে, সে তত বেশি সোচ্চার হয়েছে। দেশের নানা প্রান্তে গিয়ে সরকারের দুর্নীতি, অবিচার, ব্যার্থতার বিরুদ্ধে স্পিচ দিয়েছে। ও সবসময় বলেছে আমি সব সময় সত্য ও সুন্দরের পক্ষে। আমি কোন অন্যায় করিনি। করলে আপনাদের সামনে বক্তৃতা দেওয়ার পরিবর্তে আমার স্থান জেলখানায় হত। দিল্লি পুলিশ ৩ বছরেও মামলার চার্জশিট না দেওয়ায় কানহাইয়া কুমারের কথাই সত্য প্রমানিত হয়।
কানহাইয়া কুমারের জনপ্রিয় হওয়ার আরেকটা কারণ হলো- তার রাজনৈতিক অবস্থান খুব পরিষ্কার। সে বলে আমি একজন ছাত্র। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় পড়ি। তাই জনগনের যেসব প্রশ্ন যা তারা করার সুযোগ পায় না, আমি সেই প্রশ্নই সরকার কে করছি। তাকে একবার একজন প্রশ্ন করেছিল, ‘আপনি সব সময় মোদী সরকারের বিপক্ষে কথা বলেন, রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধে বলেন না কেন?’ তার উত্তর ছিল এমন, ‘দেশে বর্তমানে বেকারত্ব অনেক, দুর্নীতি সীমাছাড়া। এসব বিষয়ে আমি কাকে প্রশ্ন করব? বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মোদীকে না জওহরলাল নেহেরু কে?
কানহাইয়া কুমারের কাছ থেকে আমাদের অনেক কিছু শিখার আছে। কীভাবে জনগণের অধিকার নিয়ে ক্ষমতাসীনদের প্রশ্ন করতে হয়, একজন খুবই গরিব ঘরের সন্তান হয়েও কিভাবে নির্লোভ, সৎ থেকে জনগণের কাছে যাওয়া যায়। জাতি-ধর্ম-বর্ণের উর্ধ্বে শুধুমাত্র একজন মানুষ হিসেবে কীভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা যায় সেটা কানহাইয়া কুমারের কাছ থেকে শিখা উচিত।
কানহাইয়া কুমার এবার লোকসভা নির্বাচনে বেগুসারাই থেকে লড়ছে। এই নির্বাচনী খরচের ৭০ লাখ টাকাও সে ক্রাউড ফান্ডিং এর মাধ্যমে ম্যানেজ করেছে। সে মূলত তৃতীয় প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে লড়ছে। কারণ এই আসনে আছে বিজেপির ফায়ারবিগ্রেড নেতা বর্তমান মন্ত্রী গিরিরাজ সিং, "যেকিনা মুসলমানদের বলেছে কবরের তিন হাত জায়গা পেতে হলে বিজেপি কে ভোট দেয়া লাগবে"। কংগ্রেস জোটের নেতা আরজেডি’র তানভীর হাসান। কিন্তু জনগনের জোয়ার এতই বেশি কানহাইয়ার পক্ষে যে বাকি দুই প্রার্থীর ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছে। আমাদের কাছাড়, হাইলাকান্দি থেকেও অনেক যুবক নিজের পকেটের টাকা খরচ করে বেগুসারাই গিয়ে কানহাইয়া সমর্থনে প্রচার করেছেন, (ধন্যবাদ তাদেরকে)
কানহাইয়া সমর্থনে অনেক বলিউড সেলিব্রেটি-ও গিয়েছেন যেমন- জাবেদ আখতার, শাবানা আজমী, স্বরা ভাস্কর, প্রকাশ রাজ । তাছাড়া আম আদমি পার্টির অরবিন্দ কেজরিওয়ালও কানাইয়াকে সমর্থন জানিয়েছেন।
আমার কখনো ইচ্ছে ছিল না রাজনীতি নিয়ে লেখার, কিন্তু কানহাইয়া কুমারের রাজনৈতিক ভিশন, সততা, আইডোলজি আমার খুবই পছন্দ হয়েছে। কানহাইয়ার মতো রাজনৈতিক কন্ঠস্বর গরিব-মেহনতি-ধর্মনিরপেক্ষ মানুষের খুবই দরকার। সেটা বেগুসারাই হোক বা আসাম বা অন্যকোন রাজ্য।
জানি না কানহাইয়া কুমার বিহারের জাতপাত ভিত্তিক রাজনীতির উপরে উঠে জিতবে কি-না! কিন্তু আমি মন থেকে চাইচি যেন সে জিতে। পৃথিবীর যেকোন প্রান্তে গরিব মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য একটা লোকও যদি সফল হয়, তবে সেটা সকল মেহনতি-নির্যাতিত মানুষেরই বিজয়। শুভ কামনা রইল কানাইয়ার প্রতি।


No comments:
Post a Comment