ভাষা বদলি করুন

The Only way to stop any pain in your life is to accept the fact that nothing is yours, nothing was yours, and nothing will ever be yours. They are worldly attachments; given by Allah, belonging to Allah and returning beck to Allah.

April 12, 2020

গাধার গাধা, টাউনি গাধা

।। জাকারিয়া ইছলাম।।

স্কুল জীবন থেকে নেয়া এই গল্পটি, তখন সম্ভবত ক্লাস সিক্স বা সেভেনে পড়ি, গ্রামে বাড়ির পাশের স্কুল, সেই স্কুলে সৌভাগ্যবশত মাথার উপরে টিনের ছাদ থাকলেও চারদিকে দেয়ালের কোন সিস্টেমই ছিলনা। নিখাদ কাঁচা মাটির মেঝেতে বর্ষাকালে ব্যাঙ আর ইয়া মোটা কেঁচো দেখে প্রায় তাহাদেরকে বড়শিতে গাঁথিয়া মৎস শিকার করিবার চিন্তায় মশগুল তাকতাম। তবে পৃষ্ঠদেশে হঠাৎ বেতের শব্দে সেই দীবা স্বপ্নসমূহ ভাঙ্গে যেতে বিলম্ব হতনা। বর্ষাকালে বেশী বৃষ্টির কারনে যখন পানি খানিকটা বাড়িয়ে যেত, তখন স্কুলের ভিতর মাশাআল্লাহ হাঁটু পানি! কলাগাছের বোর (বোর মনে ভেলা) বানিয়ে স্কুলে যাবার সেকি মহোৎসব!! এবং স্কুলের শিক্ষা দীক্ষার অবস্থাও ছিলো তথৈবচ। শিক্ষকদের বেশিরভাগই ছিলেন আন্ডার ম্যাট্রিক। যাহাদের অনেকেই ইংরেজী বানান উচ্চারণের ভয়ে ব্ল্যাক বোর্ডে লিখে দেন। উল্ল্যেখ, গ্রামের অবস্থাপণ্ন যেসকল গৃহস্থরা মিলে স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তাদের লেখাপড়া জানা সন্তানরাই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সেই বিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েছিলেন।

একবার স্কুল পরিদর্শনে আসলেন স্কুল ইন্সপেক্টর সহকারী থানা অফিসার কে সঙ্গে নিয়ে সম্ভবত, আগের দিন আমাদের পরিপাটি ক্রিয়া সাজে গুজে অসতে বলা হয়েছিল। পূর্বের ঈদে পাওয়া নতুন কোর্তা ফুলতোলা ট্র্যিঙ্কের সুগভীর কোন থেকে সুগন্ধির সহিত বাহির করে, ভাঁজ ভাঙ্গে, গায়ে লাগিয়ে স্কুলে এসে হাজির হলাম। যথাসময়ে স্কুলে এসে হাজির হলেন মহামান্য স্কুল ইন্সপেক্টর সাহেব। ভয়ে আমাদের সকলের আত্মারার খাঁচা ছেড়ে যাইবার দশা। স্কুল ইন্সপেক্টর সাহেব গম্বীর হয়ে চৌদিকে দৃষ্টি নিবন্ধ করলেন। তিনি ভালোবাভে লক্ষ্য করলেন আমাদের চাইতে আমাদের শিক্ষকদের অবস্থা অধিকতর শোচনীয়। দরজার পাশে দেয়াল ঘেঁষিয়া দাঁড়িয়ে তাহাঁরা পরস্পরকে পরস্পরের শরীর আড়াল করতে শশব্যাস্ত।

যাই হোক! কাশিয়া গলা পরিষ্কার করিয়া মহামান্য স্কুল ইন্সপেক্টর সাহেব নানাবিধ প্রশ্ন করতে লাগলেন। আমাদের পারর্ফামেন্স লেটার মার্কস প্রাপ্তির কাছাকাছি রকমের খারাপ। কিছু প্রশ্নের উত্তর জানা তাকলেও, ভয়ে সবকিছু তালগোল পাকিয়ে ফেলিতে লাগলাম। এবং মহামান্য স্কুল ইন্সপেক্টর সাহেব তখন শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করতেছেন যে- তা সঞ্জিব সাহেব, এই ছেলেটা দেখি ভারতের পতাকার  রং কয়টা তাও জানেনা। সামনে স্বাধীনতা দীবস ছেলেটা যদি তা না যানে তাইলে পড়বেন বিরাট ঝামেলায় রংটা একটু বলে দেনতো ওকে। সঞ্জিব স্যার যথারীতি ঘামিয়ে, কাশিয়া, কাপিয়া একাকার। মহামান্য স্কুল ইন্সপেক্টর সাহেব উনার উত্তরের অপেক্ষা না করে বাদ-বাকী ছাত্রের দিকে মনোনিবেশ করলেন। অবশেষে তিনি মুন্নার দিকে দৃষ্টি স্থির করিলেন। পরিপাটি করিয়া আঁচড়ানো চুল, সুন্দর শার্ট, হাতে প্লাস্টিকের কালো বেল্টের ক্যাসিও ঘড়ি। আসলে মুন্নারা টাউনে(শহর) থাকে। পড়াশোনায় ভালো। মুন্নার বাবা টাউনে কি যেন একটা চাকুরী করতেন, তার বাবার ট্রান্সফার হয়েছে গ্রামে, তাই সে গ্রামের স্কুলে পড়ে।

তো, যাই হোক! স্কুলে এখন গোবরে পদ্মফুল, মুন্নাকে দেখে মহামান্য স্কুল ইন্সপেক্টর সাহেবের চক্ষু চমকিয়ে উটল। তিনি কাছে গিয়ে  সুমিষ্ট স্বরে মুন্নাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'বলতো বাবা, পানি কয় অবস্থায় থাকতে পারে? মুন্না সট্যান দাঁড়িয়ে বলিল পানি তিন অবস্থায় থাকিতে পারে, তরল, কঠিন এবং বায়বীয়। মহামান্য স্কুল ইন্সপেক্টার সাহেব আকস্মাৎ থমকিয়ে গেলেন। তিনি কতক্ষন চুপ করে তাকলেন, তার মুখ গম্বীর হয়ে রইল। তিনি হঠাৎ বাংলা কাম ইংলিশ ও বিজ্ঞান শিক্ষক বড়জলাল শ্যারের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, এই ছেলেটা কোথায় থেকে এসেছে? এ কি এই স্কুলের ছাত্র?  এ তো দেখি আমার মাথা আউলিয়ে ফেলেছে, বড়জলাল স্যার ছিলেন শিক্ষকদের মধ্যে কিঞ্চিৎ বেশী জানাশোনাওয়ায়ালা লোক। তিনি তার প্রতিভা প্রদ্রর্শনের একটা সুযোগ পেয়ে নিজেকে আর স্থির রাখিত পারলেন না। ঝড়ের গতিতে  আসিয়া মুন্নার কানে ধরে চিৎকার করে বলতে লাগলেন,- আরে গাধার বাচ্ছা গাধা, টাওনে তাকিস জীবনে কোনদিন পানি দেখসিস না! পানি কয়টা অবস্থায় থাকে এই এতো তুচ্চ জিনিসটাও জানিস না, অ্যা? ওই দেখ ঘাধার ঘাধা, বাইরে জমির পানির দিকে তাকিয়ে দেখ। পানি কয়টা অবস্থায় আছে। দেখেছিস? পানি থাকে দুই অবস্থায়। যখন ঢেউ থাকেনা তখন সমান-সমান অবস্থা, মানে সমতল আবস্থা... আর ঢেউ আসলে উঁচানিচা হয়ে যায়-এইটারে বলে আসমতল অবস্থা! বুঝেসস টাউনি ঘাধা! 

মহামান্য ইন্সপেক্টার সাহেব দৌড়ে এসে বড়জলাল স্যারের হাত থেকে মুন্নাকে রক্ষাকরে বলিলেন আপনার প্রতিভায় আমি মুগ্ধ ! বাদ দেন, চলেন, চলেন। সিরিয়ালে মুন্নার পরেই ছিলাম আমি... আমাকে কি প্রশ্ন করা হবে তার ভয়ে কলিজা ধড়ফড় করিয়া লাফাইতেছিল। বড়জলাল স্যারের এমন প্রতিভা আর বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে আমার ধরফরানিরত কলিজা পায়ের আঙ্গুল আই মিন 'টো" পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে গেল। আঃহা, এমন এজকন স্যার যদি প্রত্যেকের ঘরে ঘরে থাকিত!।

উল্লেখ্য, কিছুদিন পর ষাম্মাসিক পরিক্ষা।

পরিক্ষায় উক্ত প্রশ্নটি আসিলো, এবং মুন্না ব্যাতিত আমরা সকলে ওই প্রশ্নের উত্তরে একযোগে লিখিছিলাম পানি দুই অবস্থায় থাকিতে পারে-

১। বাতাস বা ঢেউ না হইলে সমতল অবস্থায়।
২। বাতাস বা ঢেউ ইইলে অসমতল অবস্থায়।

পরিশিষ্টঃ মুন্না নামের টাউনি গাধা ছেলেটি ব্যাতিত আমরা সকলেই উক্ত প্রশ্নের উত্তরের জন্য পূর্ণ নাম্বার পায়েছিলাম। এবং, মুন্নার খাতায় উক্ত প্রশ্নের উত্তরের নিচে লাল কালি দিয়ে বড়জলাল স্যার বড়-বড় অক্ষরে লিখে দিয়েছিলেন- "গাধার গাধা, টাউনি গাধা।"

( সমস্ত গল্প, ঘটনা ও চরিত্র কাল্পনিক। বাস্তবতার সাথে কোন মিল নেই।কোন অংশ বা পুরো গল্প এবং কোন চরিত্র কোন ব্যক্তি বা কোন ঘটনার সাথে মিলে গেলে লেখক দায়ী নয়। শুকরিয়া।)

No comments:

Popular Posts